বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো নিয়ে যখনই আলোচনা হয়, তখন দুটি বিষয় বারবার সামনে আসে—প্রতিবন্ধী ভাতা এবং বিএনপি প্রস্তাবিত বা আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’। একটির ইতিহাস দীর্ঘ; অন্যটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রস্তাবনা। একটি নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা; অন্যটি পরিবারভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তার বিস্তৃত কাঠামো গড়ার ধারণা। এই দুই ধারণাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বিশ্লেষণ করলে কেবল অর্থের অঙ্ক নয়, রাষ্ট্রের সামাজিক দর্শন, কল্যাণনীতির দর্শন, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং বাস্তব প্রয়োগ—সবকিছুই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ভাতা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০০৫–২০০৬ অর্থবছরে। সে সময় ক্ষমতায় ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রথম পর্যায়ে সীমিত সংখ্যক উপকারভোগীকে মাসিক ২০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া শুরু হয়। এই অঙ্ক আজকের প্রেক্ষাপটে সামান্য মনে হলেও, নীতিগতভাবে এটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ—কারণ এর মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে প্রতিবন্ধিতা কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে জড়িত একটি বাস্তবতা, যার দায় আংশিকভাবে রাষ্ট্রেরও।
পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। তারা সামাজিক সুরক্ষা খাতকে অগ্রাধিকারমূলক নীতিতে উন্নীত করে। প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়—২০০ টাকার জায়গায় ৩০০, পরে ৪০০, ৫০০, ৬০০ এবং বর্তমানে ২০২৩–২০২৪ অর্থবছরে এসে মাসিক ৮৫০ টাকা পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। উপকারভোগীর সংখ্যাও কয়েক হাজার থেকে বেড়ে কয়েক লক্ষে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, একটি ক্ষুদ্র পরিসরের কর্মসূচি সময়ের সঙ্গে একটি বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো—এই ৮৫০ টাকা কি যথেষ্ট? বাজারদর, জীবনযাত্রার ব্যয়, চিকিৎসা খরচ এবং সহায়ক উপকরণের দাম বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য মাসিক ন্যূনতম ব্যয় কয়েক হাজার টাকার নিচে নয়। হুইলচেয়ার, কৃত্রিম অঙ্গ, শ্রবণযন্ত্র, নিয়মিত ওষুধ—এসবের খরচ বহন করা ৮৫০ টাকায় সম্ভব নয়। ফলে ভাতাটি অনেকের কাছে প্রতীকী সহায়তা, পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়। আবার অনেক পরিবারে এই অঙ্কই একমাত্র নিশ্চিত নগদ আয়, যা খাদ্য কেনা বা ওষুধের খরচে সহায়ক হয়। সুতরাং ভাতার গুণ হলো—নিয়মিততা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি; দোষ হলো—পরিমাণের সীমাবদ্ধতা ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা।
এবার আসা যাক ফ্যামিলি কার্ড ধারণায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নামে একটি পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রস্তাব দেয়। ধারণাটি হলো—প্রতিটি নিম্নআয়ের পরিবারকে একটি নিবন্ধিত কার্ড দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বা সরাসরি নগদ সহায়তা পাবে। কিছু প্রস্তাবে বছরে নির্দিষ্ট অঙ্কের নগদ অনুদানের কথাও বলা হয়েছে। লক্ষ্য—দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোকে সামগ্রিকভাবে সহায়তা করা, যেন তারা খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ন্যূনতম নিরাপত্তা পায়।
ফ্যামিলি কার্ডের দর্শন প্রতিবন্ধী ভাতার চেয়ে ভিন্ন। প্রতিবন্ধী ভাতা ব্যক্তি-ভিত্তিক; ফ্যামিলি কার্ড পরিবার-ভিত্তিক। প্রতিবন্ধী ভাতা ঝুঁকিনির্ভর (disability-specific); ফ্যামিলি কার্ড আয়নির্ভর (income-based)। একদিকে নির্দিষ্ট একটি দুর্বল জনগোষ্ঠী; অন্যদিকে সামগ্রিক দারিদ্র্য হ্রাসের প্রচেষ্টা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—প্রতিবন্ধী ভাতা কি ফ্যামিলি কার্ডের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, নাকি আলাদা থাকা উচিত?
যদি পরিবারভিত্তিক সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে একই পরিবারে একজন প্রতিবন্ধী সদস্য থাকলে তার অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি কীভাবে বিবেচিত হবে? কারণ প্রতিবন্ধিতা দারিদ্র্যের কারণও, আবার ফলও। একটি দরিদ্র পরিবারে যদি একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি প্রতিবন্ধী হন, তাহলে সেই পরিবার দ্বিগুণ ঝুঁকির মুখে পড়ে। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র পরিবারভিত্তিক কার্ড দিয়ে সমাধান করলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বিশেষ চাহিদা পূরণ নাও হতে পারে। আবার পৃথক ভাতা থাকলে অন্তত তার নামে একটি নির্দিষ্ট নগদ প্রবাহ নিশ্চিত থাকে।
অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু জিডিপির তুলনায় এই খাতের বরাদ্দ এখনও সীমিত। যদি ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে কয়েক কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে এর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। সেই অর্থ কি নতুন কর আরোপ, নাকি ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে আসবে? আর সেই ব্যয় কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই?
প্রতিবন্ধী ভাতার একটি বড় সাফল্য হলো—ডিজিটাল ডাটাবেজ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীর কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে—নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, প্রকৃত প্রতিবন্ধী বাদ পড়া, অথবা ভুয়া সনদ নিয়ে ভাতা নেওয়ার ঘটনা। ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে একই চ্যালেঞ্জ আরও বড় পরিসরে দেখা দিতে পারে—কারণ পরিবারভিত্তিক দারিদ্র্য যাচাই করা জটিল ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, প্রতিবন্ধী ভাতা কেবল অর্থ সহায়তা নয়; এটি একটি প্রতীকী স্বীকৃতি যে রাষ্ট্র প্রতিবন্ধী নাগরিককে ‘দয়া’র নয়, ‘অধিকার’র জায়গা থেকে দেখছে। অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ডের ধারণা পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু পরিবার সবসময় সমান নিরাপদ নয়—অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী সদস্য পরিবারেই অবহেলার শিকার হন। যদি তার নামে আলাদা ভাতা না থাকে, তবে পরিবারভিত্তিক সহায়তা তার ব্যক্তিগত ক্ষমতায়নে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দুটি কর্মসূচি প্রায়ই দলীয় কৃতিত্বের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। এক পক্ষ বলে—প্রতিবন্ধী ভাতা আমরা শুরু করেছি; অন্য পক্ষ বলে—আমরা পরিমাণ বাড়িয়েছি ও সম্প্রসারণ করেছি। আবার ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে বলা হয়—এটি হবে দারিদ্র্যমুক্তির নতুন দিগন্ত। কিন্তু নাগরিকের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কে শুরু করল তা নয়; কতটা কার্যকর, স্বচ্ছ ও টেকসই হলো।
বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে ৮৫০ টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা জীবনযাত্রার ন্যূনতম ব্যয়ের তুলনায় কম। একইভাবে, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় যদি বছরে ১০–১৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়, তাও একটি বড় পরিবারের জন্য সীমিত। অর্থাৎ, উভয় কর্মসূচিরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে তাদের শক্তিও আছে—প্রতিবন্ধী ভাতা ব্যক্তি-স্বীকৃতি ও নিয়মিততার শক্তি বহন করে; ফ্যামিলি কার্ড বহন করে সামগ্রিক দারিদ্র্য মোকাবিলার সম্ভাবনা।
একটি উন্নত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় উভয় ধরনের সহায়তা সহাবস্থান করতে পারে। পরিবারভিত্তিক মৌলিক সহায়তা থাকবে, পাশাপাশি ঝুঁকিনির্ভর বিশেষ ভাতা—প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, বিধবা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা ইত্যাদি। এতে পরিবার যেমন সুরক্ষা পাবে, তেমনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি আলাদা স্বীকৃতি ও সহায়তা পাবে।
সবশেষে বলা যায়, প্রতিবন্ধী ভাতা বনাম ফ্যামিলি কার্ড—এটি শূন্য-সম খেলা নয়। এটি হওয়া উচিত পরিপূরক সম্পর্ক। রাষ্ট্র যদি সত্যিই সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে তাকে অঙ্কের রাজনীতি ছাড়িয়ে নীতির গভীরে যেতে হবে। প্রতিবন্ধী নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই সামাজিক সুরক্ষা কেবল বাজেটের একটি লাইন আইটেম নয়, হয়ে উঠবে মানবিক রাষ্ট্রের ভিত্তি।
মো: বোরহান উদ্দিন
সমাজকর্মী, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক
