ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি –
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযান ও প্রশাসনিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। উপজেলা সদর থেকে শুরু করে দুর্গম চরাঞ্চল পর্যন্ত ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইনের মতো মাদকের বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের একটি অংশ মাদকের ঝুঁকিতে জড়িয়ে পড়ায় চিন্তিত স্থানীয় সচেতন মহল।
মাদক নিয়ন্ত্রণে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে সম্প্রতি একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভের নেতৃত্বে পরিচালিত ৯টি মোবাইল কোর্টে ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে চরভদ্রাসন থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে গত কয়েক মাসে ১১টি মাদক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১০ জনকে তাৎক্ষণিক বিচারে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।
প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত মোবাইল কোর্টে দুইজনকে ছয় মাস করে এবং সাতজনকে এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ১০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন মানিক মোল্লা (২৬), রিমা আক্তার (২০), শেখ মাসুদ (২৮), রুবেল শেখ (৩৫), মোহাম্মদ আশরাফুল (৪০), মো. মজিবুর রহমান (৪০), মো. বাবলু (৪৭), প্রকাশ চন্দ্র শীল (২৮) ও রাশেদ মৃধা (৩০)।
এদিকে চরভদ্রাসন থানা সূত্র জানায়, পুলিশের বিশেষ অভিযানে গত কয়েক মাসে ১১টি মাদক মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাঁদের কাছ থেকে ৩১৭ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ জনকে আদালত তাৎক্ষণিক বিচারের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন।
পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন জামাল বেগ (৪০), রাশেদুল খান রাজিব (২০), সাগর (২৮), সেলিম বেপারি (৪৩), মোনাইম সরদার (৩৪), মাসুম শেখ (৪৪), মো. লালন খা (২৮), চম্পা বেগম (৫৫), মুক্তা আক্তার (২৫), কামাল মোল্যা (৪৫), মনু মালো (৪০), আলম শেখ (৩০) ও রিপন সরদার (৩২)।
তবে এতসব অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও মাদকের বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পদ্মা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে মাদকের সরবরাহ ও বেচাকেনা চলছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রবাসী পরিবারের কিছু সন্তান পর্যাপ্ত পারিবারিক তদারকির অভাবে বিপথে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাঁদের একটি অংশ বিলাসবহুল মোটরসাইকেল নিয়ে বিভিন্ন স্থানে আড্ডা ও বেপরোয়া চলাফেরায় জড়িয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি মাদকের সংস্পর্শে আসার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাদক পরিস্থিতি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, উপজেলায় মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রশাসনিক অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক সংগঠক, সমাজকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
চরভদ্রাসন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সফর আলী বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু পুলিশের একার নয়। পুলিশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
থানার সেকেন্ড অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) এনামুল হক জানান, মাদক নির্মূলে চরভদ্রাসন থানা পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। মাদকের সঙ্গে যে পরিবারের সন্তানই জড়িত থাকুক না কেন, অপরাধ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণ ও যুবসমাজকে সচেতন করার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারের মধ্যে মাদকবিরোধী কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে মাদকের উৎস, সরবরাহ ও বিক্রির নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ বাড়ানো গেলে চরভদ্রাসনে মাদকের বিস্তার রোধে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব।
