ইকবাল হোসেনের ‘নিয়ন্ত্রণে’ লক্ষ্মীপুর সদর এলজিইডি? কাজ শেষ হয়নি, ফাইনাল বিল ৩৩ কোটি টাকা

শেয়ার

ইকবাল হোসেনের ‘নিয়ন্ত্রণে’ লক্ষ্মীপুর সদর এলজিইডি?
কাজ শেষ হয়নি, ফাইনাল বিল ৩৩ কোটি টাকা

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা  প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। উন্নয়নকাজের বিল ছাড়ে ‘৫ শতাংশ কমিশন’ দাবির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তদন্ত চলার মধ্যেই এবার কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই প্রায় ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার ফাইনাল বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে।
লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবন এবং মহিলা হোস্টেল নির্মাণকাজে এই বিপুল অঙ্কের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ সরেজমিনে ভবন দুটির বিভিন্ন অংশে এখনো নির্মাণ ও ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে,  কাজ শেষ না হলে কীভাবে ফাইনাল বিল দেওয়া হলো? কে কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যয়ন দিয়েছেন? আর এই বিল অনুমোদন ও পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়ায় সদর উপজেলা প্রকৌশলী ইকবাল হোসেনের ভূমিকা কী ছিল?

শনিবার (১৫ আগস্ট) লক্ষ্মীপুর  পিটিআই প্রাঙ্গণে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন অংশে এখনো কাজ চলছে। আস্তর, রং, টাইলস, দরজা-জানালা, ফ্যান, লাইট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ফার্নিচারসহ বিভিন্ন কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, মহিলা হোস্টেল ভবনেরও প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি। তবে দুটি ভবনের বিপরীতে প্রায় ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা ফাইনাল বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথি থেকে জানা গেছে।
এর মধ্যে একাডেমিক কাম প্রশাসনিক  ভবনের বিল প্রায় ২১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং মহিলা হোস্টেল ভবনের বিল প্রায় ১১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

এলজিইডির নথি অনুযায়ী, পিটিআইয়ের পাঁচতলা একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবন নির্মাণকাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ২২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। কাজ শুরুর তারিখ ৬ ডিসেম্বর ২০২৩ এবং নির্ধারিত  সমাপ্তির তারিখ ছিল ১৪ অক্টোবর ২০২৪।
অন্যদিকে মহিলা হোস্টেল নির্মাণকাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ১৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এ কাজের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা। কাজ  শুরুর তারিখ ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪ এবং নির্ধারিত সমাপ্তির তারিখ ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
দুই প্রকল্পের মোট চুক্তিমূল্য প্রায় ৩৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩৩ কোটি ১৯  লাখ টাকা ফাইনাল বিল হিসেবে পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, অর্থবছরের শেষের জুন ক্লোজিংকে কেন্দ্র করে দ্রুত  বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতির তুলনায় বিল পরিশোধের গতি ছিল বেশি। বিল দেওয়ার সময় কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। ফাইনাল বিলের সঙ্গে থাকা পরিমাপ বই (এমবি), কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যয়ন, বিল অনুমোদনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যয়ন পরীক্ষা করা হলে বিষয়টি পরিস্কার হবে।

এর আগে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন  প্রকল্পের বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগের পর গত ১৫ জুলাই এলজিইডি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
অভিযোগের মধ্যে নির্মাণাধীন মসজিদ, কালভার্ট, গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের বিল অনুমোদনে কমিশন দাবির কথা বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
গত ২৮ জুলাই তদন্ত কমিটি সরেজমিনে  তদন্ত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে তদন্তের ফলাফল বা ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, সদর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে ইকবাল হোসেন দপ্তরের বিল, কাজের পরিমাপ ও তদারকির ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব রাখছেন। তাঁর বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলা ৫নং চরপাতা ইউনিয়নের চরপাতা গ্রামে। তিনি নিয়মবহির্ভূত ভাবে বর্তমানে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এনিয়ে সংবাদ  প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হওয়ার অভিযোগও উঠে। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় তিনি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন।

ফাইনাল বিলের বিষয়ে ইকবাল হোসেনের  বলেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কাজ সম্পূর্ণ হবে। তখন আসেন, সে সময় তথ্য দেব। এখন কোনো তথ্য দেওয়া যাবে না।

সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বেলাল হোসেন ফাইনাল বিল নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমি ফাইনাল বিল নিয়েছি, তবে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাইনি। কাজ দ্রুত শেষ করে দিচ্ছি।

লক্ষ্মীপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী ফাইনাল বিল দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার  করেছেন। তবে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য তিনি অনুরোধ করেছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুর সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, একদিকে ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ৫ শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগে তদন্ত চলছে, অন্যদিকে তাঁর আওতাধীন এলাকায় কাজ শেষ হওয়ার আগেই কোটি কোটি টাকার  ফাইনাল বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে।
দুটি ঘটনা আলাদা হলেও একই দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে সরকারি  অর্থে নির্মিত ভবনের কাজ যদি বাস্তবে অসম্পূর্ণ থাকে, অথচ তার বিপরীতে ফাইনাল বিল পরিশোধ হয়ে যায়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ জন্য পিটিআইয়ের দুই ভবনের পরিমাপ বই, ফাইনাল বিল, কাজ সম্পন্ন হওয়ার সনদ, গুণগত মান পরীক্ষার প্রতিবেদন, ঠিকাদারের বিল-সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যয়ন পর্যালোচনা করা জরুরি।
কারণ, প্রায় ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা ফাইনাল বিল হিসেবে পরিশোধের পরও যদি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ ও ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি থাকে, তাহলে প্রশ্ন শুধু ইকবাল হোসেনকে ঘিরে নয়, সরকারি প্রকল্পের বিল অনুমোদন ও তদারকির পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও।

সম্পর্কিত খবর

কোন উইজেট পাওয়া যায়নি. উইজেট পৃষ্ঠায় যান এবং অফক্যানভাস সাইডবার উইজেট এলাকায় উইজেট যোগ করুন।.