মইনুল আবেদীন খান, বরগুনা, প্রতিনিধি :
গেদু ঈদ করমু ক্যামনে তোরে ছাড়া? ঈদের আগেই তো মোগো ছাইড়া গেলি । মোর গেদুরে ছাড়া কীসের আনন্দ করমু? আর কিসের ঈদ? গেদু মোরে এবার কইছিল ঈদের আগে নতুন বাড়ি বানাইবো। এ বছর নতুন বাড়িতেই ঈদ করবো। মোর বাজানের কোনও স্বপ্নই পূরণ হইলো না! ও আল্লাহ তুমি গেদুরে ক্যা লইয়া গেলা?’
ইউক্রেনে রকেট হামলায় নিহত বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান আরিফের মা রাশিদা বেগম এভাবেই ঘরের বারান্দায় বসে বিভিন্ন ভাবে আকুতির মধ্যে দিয়ে ছেলে হারানোর তীব্র যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করে। অন্য দিকে পাশেই বসা হাদিসুরের বাবা আবদুর রাজ্জাক ছেলে হারানোর যন্ত্রণার বুকে চেপে কাঁদতে কাঁদতে যেন পাথর হয়ে গেছে। শত চেষ্টা করেও থামাতে পারছে না হাদিসুরের মা রাশিদা বেগম ও বাবা রাজ্জাকের অশ্রু ঝরা কান্না।
যখন সারা দেশে ঘরে ঘরে ঈদ আনন্দের জোয়ার বইছে তখন বরগুনা জেলাধীন বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামে হাদিসুরের বাড়িতে বইছে শোকের মাতম বরং পূর্বের ঈদের আনন্দের সুখস্মৃতি বেদনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। স্বজনদের আহাজারিতে এখনও শোকে স্তব্ধ গোটা বাড়ি। হাদিসুর নেই এটা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না স্বজনরা। এক অজানা অমাবস্যার কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে গোটা বাড়ি। হাদিসকে ছাড়া পরিবারটিতে আনন্দ উৎসব যেন কল্পনা করা যেত না। এখন তাকে ছাড়া হারিয়ে গেছে সব আনন্দ।
হাদিসুরের মা রাশিদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বাজানে কত স্বপ্ন বুকে লইয়া চইলা গেছে মোগো ফাঁকি দিয়া। বাজানে কইছিলো এ বছর এই ঘর ভাইঙ্গা নতুন ঘর উঠাইবে। সেই সঙ্গে বাজানে মোর ঘরে নতুন মেহমান নিয়া আসার কথা কইছিল, এবার আইয়াই বিয়া করমু।’ হাদিসের সপ্ন যেনো সপ্নই রইয়া গেলো।
সবশেষ বছর চারেক আগে বাড়িতে ঈদ করেছিলেন হাদিসুর,তখন মাকে হাসির ছলে হাদিসুর বলেছিলেন, ‘এ বছর মনে হয় তোমার সঙ্গে আমার শেষ ঈদ। এরপর থেকে তো আর তোমাদের সঙ্গে ঈদ করতে পারবো না। থাকতে হবে সাগরে সাগরে। কখন আসতে পারি তার কোনও ঠিক-ঠিকানা নাই। এই কথা মনে উঠতেই চিৎকার করে কেঁদে উঠে তিনি।তিনি আরও বললেন,’এই রহম যে একেবারে ফাঁকি দিয়া যাইবে মোরা কেউ বুঝি নাই।’
অন্য দিকে হাদিসুরের বাবা আবদুর রাজ্জাক মাস্টার বলেন, ‘আমি স্থানীয় একটি বেসরকারি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতাম।সেখান থেকে অবসরের পর হাদিসুরই ছিল আমাদের একমাত্র সংসারের ভরসা। ঈদ বলেন আর কোরবানি বলেন, সবকিছু ছিল হাদিসকে ঘিরে। আজ হাদিস নেই । আমার আদরের ধন হারিয়ে যাওয়ায় ঈদ করমু ক্যামনে?’প্রতি বছর ঈদে আরিফ বাড়ি এসে আমাদের জন্য কেনাকাটা করে। না আসতে পারলে ভাইগো দিয়া আমাদের জন্য নতুন পোশাক কেনায়। এ বছর বাজানে চাইছিল বাড়িতে আইবে, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে ঈদ করবে। কিন্তু আল্লাহ ওর ইচ্ছাটা পূরণ করলো না। এবার ঈদে আমাকে আর কেউ কাপড় কিনে দেবে না। হাদিসুর সালাম করে না আর দোয়া চাইবে না। আমাদের ঈদ আনন্দ হাদিসের সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে।’
হাদিসুরের ছোট ভাই প্রিন্স বলেন, “প্রতি বছর ঈদ এলে পরিবারের সবাইকে পছন্দের পোশাক কিনে দিতেন ভাইয়া। এবার ঈদে বাড়িতে এসে বিয়ে করার কথা ছিল তার। এবার ঈদে সবাই আছে, নেই শুধু ভাইয়া। আমরা আমাদের ভাইয়াকে ছাড়া কীভাবে ঈদ করব? বাবা-মায়ের পরে প্রতিটি ঈদের স্মৃতিতে ভাইয়া জড়িয়ে রয়েছে।”
হাদিসুর ২০০৮ সালে বেতাগী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ ও বেতাগী সরকারি কলেজ থেকে ২০১০সালে এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৯৫ পেয়ে পাস করার পরে ভর্তি হন চট্টগ্রামের মেরিন অ্যাকাডেমিতে,সেখান থেকে বের হয়ে ২০১৪ সালে সিঙ্গাপুরের একটি জাহাজে নৌ প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন হাদিসুর। ২০১৮ সালে এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন তিনি।
প্রসঙ্গত, রাসিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ চলাকালীন অলভিয়া বন্দরে আটকে থাকা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি গত ২ মার্চ রকেট হামলার শিকার হয় ’। এতে নিহত হন ওই জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান।
গত ১৪ মার্চ রোজ (সোমবার) দুপুর ১ টা ১৫ মিনিটে হাদিসুরের কফিন বন্দী লাশ বাংলাদেশ পৌছালে ১৫ মার্চ রোজ (মাঙ্গবার) সকাল ১০ টায় তার নিজ বাড়িতে জানাজা সম্পূর্ন করে দাদা-দাদির কবরের পাসে তাকে দাফন দেওয়া হয়।
নিহত হাদিসুরের গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা, বড় এক বোন ও ছোট দুই ভাইসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন। প্রিয় স্বজনকে হারিয়ে এবার বিবর্ণ আর আনন্দবিহীন ঈদ পালন করছেন তারা।
