প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরকারি খাস পুকুরকে ব্যক্তি মালিকানায় বন্দোবস্তের অভিযোগ উঠেছে। পুঠিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা খাদেমুল ইসলাম, কম্পিউটার অপারেটর সজিব ও বাপ্পি জালিয়াতির মাধ্যমে এই জালিয়াতি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এ ঘটনায় এলাকায় বেশ আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে এলাকায়। এমন জালিয়াতির ঘটনায় স্থানীয়রা বেশ ক্ষুব্ধ।
অভিযোগ উঠেছে, নায়েব খাদেমুল ইসলাম শিলমাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে একটানা প্রায় ৫ বছর যাবত কর্মরত আছেন। তিনি কম্পিউটার অপারেটিং কোন কাজ জানেন না। তার পছন্দের কম্পিউটার অপারেটর সজিবকে পাশে বসিয়ে জমিসংক্রান্ত সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মনগড়া সিদ্ধান্ত চাপিয়ে অবৈধভাবে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে। খাজনা পরিশোধ, নামজারি-জমাভাগ ইত্যাদি কাজের জন্য জমির মালিকদের কাছ থেকে একেক সময় একেক কথা বলে অযথা হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ অফিসে ঘুষ না দিলে ধানী, পুকুর, বাড়ির জমিতে সরকারি নিয়ম বহির্ভূতভাবে খাজনা আদায় করে থাকেন। তাদের দাবিকৃত ঘুষের টাকা দিলে মওকুফ করে খাজনা আদায় করা হয়। এছাড়াও ভূমি অফিসের সকল জমির মালিকদের আইডি পাসওয়ার্ড খুলে খাজনা আদায়ের নিয়ম থাকলেও সেই নিয়মে কোন কাজ হয় না। সব দালালদের নামে আইডি পাসওয়ার্ড খুলে খাজনা আদায় করা হয়। সরকারি খতিয়ানের খাস পুকুর বন্দোবস্তে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন না নিয়ে জালিয়াতি করে ভুয়া হোল্ডিং খুলে খাজনা আদায় করেছে নায়েব খাদেমুল। তিনি চলতি বছরের গত ২৮ আগস্ট খাস পুকুরের ভুয়া হোল্ডিং বসিয়ে অনুমোদন করিয়ে দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিলমাড়িয়া ইউনিয়ন ভুমি অফিসের ১১১ নং পচামাড়িয়া মৌজার ৩৮৫/১ নং জমাবন্দিতে সরকারি খাস পুকুরের তালিকাভুক্ত ২৩৪ দাগে ৩২ শতক, ৫৯৮ দাগে ১৮ শতক, ৩১৩ দাগে ৫৫ শতক ৩২৪ দাগে ২৮ শতক জমি ব্যাক্তি মালিকানায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে ভুয়া হোল্ডিং অনুমোদন করে খাজনার চেক প্রদান করেন খাদেমুল ইসলাম। এছাড়াও এই খাজনার আদায় বইয়ে ভুয়া একটি খারিজ কেস নাম্বার ব্যবহার করা হয়, যার কেস নম্বর- ৮৯৮/৯-১/৮৯-৯০। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওই খারিজ নাম্বারটি একই হোল্ডিং এ আছে, যা অন্য ব্যক্তির নামে ২৮/৮/২০২৩ ইং তারিখে সরবরাহকৃত; যা দাখিলা নম্বরে দেওয়া হয়েছে ৮১৮২২৩০৪৩৫৩৩।
পরবর্তীতে কাগজটি পাকাপোক্ত করতে গত ৩ সেপ্টেম্বর একই হোল্ডিং এর বাংলা ১৪৩১-১৪৩৩ সাল পর্যন্ত অগ্রীম খাজনা নেওয়া হয়েছে। আবার, ৭১ নম্বর সোবনপাড়া মৌজার ৪২ নম্বর খতিয়ান এর ১৮১ দাগে ৩৮ শতক হোল্ডিং নম্বর ৪১ মূল পাতায় যে জমির হিসাব ছিল সে পাতাটি ছিঁড়ে নতুন ভাবে হোল্ডিং খুলে বিপক্ষে খাজনা আদায় করতে দেখা যায় নায়েব খাদেমুলকে।
পুকুরটির লিজ গ্রহণকারী ছিলেন পুঠিয়ার শিলমাড়িয়া গ্রামের রশিদ। জানতে চাইলে ভুক্তভোগী রশিদ বলেন, জানতে পারি নায়েব খাদেমুল পুরাতন হোল্ডিং বইয়ের পাতা ছিঁড়ে বইতে নতুন হোল্ডিং পাতা লাগিয়ে আমার বিপক্ষের লোকের কাছ থেকে খাজনা আদায় করেছে। আমি স্বল্প শিক্ষিত মানুষ। কাগজে কলমে কম বুঝি। এনিয়ে বছর তিন চারেক যাবত ভূমি অফিসের বারান্দায় ঘুরছি। তবুও প্রতিকার না পেয়ে উল্টো প্রতারণার শিকার হয়েছি। তিনি বলেন, নায়েব খাদেমুল কম্পিউটার অপারেটর সজিব-বাপ্পি, উমেদার আয়ূব ও লোকমান জালিয়াতি করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট মহল এদের ব্যবস্থা নিচ্ছে না। একারণেই এরা আজ এতো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
প্রসঙ্গত, এর আগে শিলমাড়িয়া ইউনিয়ন ভুমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা খাদেমুল ও বহিরাগত দালালদের ঘুষ বাণিজ্যের গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশে দালালদের বিতাড়িত করা হয়। কিন্তু বিতাড়িত দালালরা কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও নায়েব খাদেমুলের অলৌকিক ক্ষমতা বলে তারা আবার ফিরে আসে পুঠিয়া ভূমি অফিসে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে এই ভূমি অফিসের দুর্নীতির গল্পের কোনো শেষ নেই।
এ ব্যাপারে পুঠিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) দেবাশীষ বসাক বলেন, সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় খাজনা নেওয়ার সুযোগ নাই। যদি এমনটি হয়ে থাকে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) একেএম নুর হোসেন নির্ঝর মুঠোফোনে বলেন, রের্কডে যদি খাস পুকুর থাকে তাহলে ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়ার কোন সুযোগ নাই। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলেও জানান তিনি।
