শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি নীতিমালায় ই অরাজকতা তৈরি করছে

শেয়ার

বুদ্ধিমান লোকেরা একবারই অপমান সহ্য করে,আর মহান হলে হয়ত একাধিক।কিন্তু জ্ঞানপাপী মূর্খ আর সাধারন মূর্খরা বারবারই অপমান সহ্য করে।এটির প্রমান বহু রাজনৈতিক আর প্রশাসনিক নেতার মাঝেই রয়েছে।শিক্ষক সমাজ তার ঠিক উল্টো।তারা অতিশয় মহান বিধায় একাধিকবার অপমান সহ্য করে এখনো স্থিরবদ্ধ রয়েছে।না হলে অনৈতিক,অন্যায় ৪% অতিরিক্ত কর্তন অমানবিক জেনে ও মূর্খ নেতাদের মত হাঙ্গামা আর ভাংচুর,জ্বালাও পোড়াও,হরতাল অবরোধ তার কিছুই করে নাই।আজ পুলিশের ১% বেতন কাটুক পরদিন সরকারের ভিত নড়ে যাবে,আমলাদের তার অর্ধেক কাটুক সরকারের পতন হয়ে যাবে,মন্ত্রীদের তার অর্ধেক কাটুক উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যহত হয়ে যাবে,সেনা বাহিনীর তার অর্ধেক কাটুক সরকার ভয়ে কেঁপে উঠবে।তাহলে শিক্ষকদের ৪% শতাংশ কেটে দিলেন, আর শিক্ষকরা শান্তিপূর্ন আন্দোলন করলে, সেটিকে পাগল বলে গালি দিবেন?শিক্ষকদের সাথে আজ রাষ্ট্র সর্বস্তরেই বিভেদ- বৈষম্য তৈরি করছে।

এক• বিসিএস শিক্ষকদেরকে পররাষ্ট্র, প্রশাসন, বিচার, ট্যাক্স ও পুলিশ ক্যাডারের মত সুবিধা দেওয়া হয়নি।ফলে বিসিএস শিক্ষকদেরকে সরকার অন্যান্য ক্যাডারদের তুলনায় বঞ্ছিত করছে।ফলে শিক্ষা ক্যাডার থেকে কোটায় যে সব শিক্ষক উপ সচিব হন তারা অন্যান্য ক্যাডারদের সুবিধা দেখে নিজের শিক্ষা ক্যাডার পরিচয় লুকাতে বাধ্য হন।এর জন্য দায়ী কে? নিশ্চয় রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারকদের ভারসাম্যহীনতা।কারন তারা যে শিক্ষকের কাছে অধ্যয়ন করে আজ নীতি নির্ধারক হয়েছেন ,তারাইতো শিক্ষকদের পদমর্যাদা ১ম শ্রেণীতে রাখতে চায়না।

দুই•প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডের দাবিতে অনড়।কারন প্রধান শিক্ষক আর সহকারি শিক্ষকদের গ্রেড আকাশ পাতাল পার্থক্য।এমতাবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষা মান হারাচ্ছে দ্রুতবেগে।

তিন• ১৯৯০ সালের শিক্ষক ও কর্মচারি কল্যান ট্রাস্ট ২৮ নং আইনের ১০(২) উপধারা অনুযায়ী কোন শিক্ষক কর্মচারি কল্যান ট্রাস্টে চাঁদা দিতে বাধ্য নয়।চাঁদা প্রদান করলে সুবিধা পাবেন অন্যথায় পাবেন না।এই আইন অনুযায়ী ২% মাসিক চাঁদা কর্তনের বিনিময়ে চাকরি শেষে ২৫ মাসের মূল বেতনের সম পরিমান সুযোগ সুবিধার কথা বলা হয়েছে।তাহলে আইন অনুযায়ী প্রথমত বাড়তি কর্তন করতে হলে শিক্ষকদের অনুমতি লাগবে,২য়ত ১২৫ মাসের সুবিধা ঘোষনা করতে হবে।কিন্তু ৭৫ মাসের সুবিধা বহাল রেখে (যা ৬% কর্তনে পাওয়া যেত) কোন যুক্তিতে বাড়তি ৪% কর্তন? এটি অসাংবিধানিক নয় কী?এর ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক,মাদ্রাসা,কারিগরিতে অচল অবস্থার সৃষ্টি হলে দায়ভার কার উপর বর্তাবে?

চার• অবসর কল্যানের ২৪৩৫০ টি ফাইল সমাধানে ১৭৫৯ কোটি ২৫ লক্ষ্য টাকার প্রয়োজন,এসটিডির ২১৬ কোটি+ এফডিআর এর ১২৮ কোটি+ ২০১৮ – ২০১৯ অর্থবছরের সরকারি বাজেট ৫৩২ কোটি= ৮৭৬ কোটি টাকা,তা দিয়ে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত ১৫০০০ ফাইল সমাধান হয়ে যায়।বাকী ৯ হাজার ফাইলের সমস্যা সমাধানে ২০১৯ – ২০২০ অর্থবছরে আরেকটি সরকারি বরাদ্দ প্রয়োজন।মাসিক অবসর বাবদ ৩৫×১২= ৪২০ কোটি + কল্যান বাবদ ১৭×১২= ২০৪ কোটি =৬২৪ কোটি টাকা হলেই সমস্যার সমাধান।তদুপরি যদি আর ও কোন কারনে অর্থ ঘাটতি থাকেও তাহলে ১৯৯৯ সালের কল্যান ট্রাস্টের ৬(৩) উপধারা অনুযায়ী ছাত্র- ছাত্রীদের থেকে ৫ টাকা করে চাঁদা তুললেই ১ কোটি ৩৩ লাখ ছাত্র- ছাত্রী ×৫= ৬কোটি ৬৫ লাখ টাকা হয়।এই টাকা দিয়ে শুধু ৪% বাড়তি কর্তন সমস্যার সমাধান ই হবেনা বরং বাড়তি টাকা পড়ে থাকবে।

পাঁচ•বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নং ধারা মতে”সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।” ২৮(১) অনুযায়ী কেবল ধর্ম,গোষ্ঠী, বর্ণ,নারী পুরুষ ভেদে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য করবেনা।”২৯(১)অনুযায়ী ” প্রজাতন্ত্রে কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের সমতা থাকবে।” ২৯(২) অনুসারে ” কেবল ধর্ম,বর্ন,গোষ্ঠী, নারী- পুরুষভেদে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হবেনা কিংবা রাষ্ট্র তার প্রতি বৈষম্য করবেনা।” উপরের সাংবিধানিক আলোচনার আলোকে মাদ্রাসার কামিল মাস্টার্স সমমান হওয়া সত্বেও কামিল পাসে প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপ্যাল পদে হুজুররা নিয়োগের অধিকার পেলে জেনারেল শিক্ষকরা কেন মাস্টার্স পাসে পিন্সিপ্যাল – ভাইস প্রিন্সিপ্যাল নিয়োগের অধিকার পাবেন না?এতে সংবিধান কী লংঘিত হচ্ছে না?

ছয়• সরকার ৩৬৯ টি স্কুল ও ২৯৯টি কলেজ জাতীয়করন করল ।করুক তাতে দুঃখ নাই বরং তা আনন্দের। আরো প্রতি উপজেলায় একটি করে বিদ্যালয় জাতীয়করনের ঘোষনা দিল।২০২১ সালের মধ্যে সব স্কুল জাতীয়করনের আশ্বাস ও সাবেক অর্থমন্ত্রী দিলেন,কিন্তু একটি মাদ্রাসা ও জাতীয়করন করলেন না,জাতীয়করন করবেন কিনা তার ঘোষনা ও সরকারের মুখে নেই। জাতীয়করনকৃত স্কুল- কলেজের মাসিক বেতন ৭ টাকা।সাথে দুপুরের নাস্তা,বাড়তি টিউশন ফি ও নানাবিধ সুযোগ- সুবিধা তো আছেই।অন্যদিকে মাদ্রাসায় যারা লেখা পড়া করছে তাদের ৩০% চরম দারিদ্র্য সীমার নীচে,৩২% দারিদ্র্য সীমার নিচে,১৮% মধ্যবিত্ত, ২০% স্বাবলম্বী সীমাতে বাস করছে, এমতাবস্থায় মাদ্রাসার মাসিক বেতন ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ১৫০টাকা থেকে ২০০ টাকা কিংবা তারও বেশি।ফলে স্কুল- কলেজের জাতীয়করনের ফলে সেখানে বেতন যেমনি কমে যাবে অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ও বাড়বে।এমতাবস্থায় ছাত্র-ছাত্রীরা এবং অভিভাবকেরা স্কুল মুখী হবে।ফলে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করানোই মাদ্রাসার জন্য একুশ শতকের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে।মাদ্রাসা ধ্বংশের মুখে পড়বে।তাই মাদ্রাসা জাতীয়করন ছাড়া মাদ্রাসার ভবিষ্যৎ রক্ষা অসম্ভব।

লেখক, ফিরোজ আলম,প্রভাষক ও বিভাগীয় প্রধান, আয়েশা (রা:) মহিলা কামিল(অনার্স,এম এ) মাদ্রাসা, সদর, লক্ষীপুর ও সাধারন সম্পাদক বিএমজিটিএ লক্ষীপুর জেলা শাখা।

কোন উইজেট পাওয়া যায়নি. উইজেট পৃষ্ঠায় যান এবং অফক্যানভাস সাইডবার উইজেট এলাকায় উইজেট যোগ করুন।.