কর্মজীবন পরিকল্পনা নীতিমালা হচ্ছে ক্যাডার কর্মকর্তাদের

শেয়ার

উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য কর্মজীবন পরিকল্পনা নীতিমালা তৈরি করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ নীতিমালার আওতায় প্রতিটি ক্যাডারের জন্য পৃথক পৃথক কর্মজীবন পরিকল্পনা থাকবে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ ক্যাডার নিজস্ব কর্মজীবন পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করে তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। শিগগিরই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মজীবন পরিকল্পনা নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

বিভিন্ন সময় জনপ্রশাসন সংস্কারে গঠিত কমিশনের সুপারিশের আলোকেই এ নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।

নীতিমালা অনুসারে নিয়োগে মেধার প্রাধান্য, পদোন্নতিতে প্রশিক্ষণের ফলাফল এবং উদ্ভাবনী কাজের জন্য পুরস্কার ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে সরকারি সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে মানবিক মানবসম্পদ তৈরি করবে সরকার। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি)-২০৩০ এবং ভিশন-২০৪১-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে মেধাবী, দক্ষ ও জনমুখী সিভিল সার্ভিস গড়ে তুলতে সরকারের এ পদক্ষেপ, যা ক্যাডার কর্মকর্তাদের ‘কর্মজীবন পরিকল্পনা নীতিমালা ২০২৩’ হিসাবে অভিহিত হবে।

নীতিমালা তৈরির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ও প্রশিক্ষণ অনুবিভাগের (সিপিটি) অতিরিক্ত সচিব ড. মো. সহিদউল্যাহ যুগান্তরকে বলেন, চাকরিতে প্রবেশের পর কোন স্তরে কী করতে হবে, তা থাকছে এ নীতিমালায়। পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রশিক্ষণ-সবই থাকবে কর্মজীবন পরিকল্পনা নীতিমালায়। প্রতিটি ক্যাডারের জন্য পৃথক পৃথক কর্মজীবন পরিকল্পনা থাকবে। তবে অনুসরণের ভিত্তি হবে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মজীবন পরিকল্পনা নীতিমালা। এ কারণে আমরা আগে প্রশাসন ক্যাডারের নীতিমালা তৈরি করে পরে অন্য ক্যাডারেরগুলো পরিমার্জন করে দেব। তিনি আরও বলেন, নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজ মাঝখানে কিছুদিন স্থগিত ছিল। এখন আর বেশি সময় লাগবে না।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, প্রতিবছর শূন্য পদের সংখ্যাভিত্তিক ক্যালেন্ডার প্রকাশ করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সুপারিশ পাওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা চূড়ান্ত করবে। পেশাগত দক্ষতা বিশ্বমানে উন্নীত করতে চাকরির প্রতিটি ধাপে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে চাকরিকাল, কর্মমূল্যায়ন প্রতিবেদন, বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে প্রাপ্ত নম্বর, শিক্ষাগত যোগ্যতা, শৃঙ্খলা প্রতিবেদন এবং সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) মূল্যায়ন বিবেচনা করে নির্দিষ্ট নম্বর বণ্টনের বিধান থাকবে।

সেক্ষেত্রে উপসচিব পদে পদোন্নতি পেতে সিনিয়র সহকারী সচিব বা সমমর্যাদার পদে পাঁচ বছর সন্তোষজনক চাকরির জন্য ১০, কর্মমূল্যায়নে ৫০, বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে ১০, শিক্ষাগত যোগ্যতায় ১০, শৃঙ্খলা প্রতিবেদনে ১০ এবং এসএসবির মূল্যায়নের জন্য ১০ নম্বর থাকবে। যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেতে উপসচিব পদে তিন বছর চাকরির জন্য ১০, কর্মমূল্যায়নে ৫০, অ্যাডভান্স কোর্স অন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (এসিএএম) প্রশিক্ষণে ১০, শিক্ষাগত যোগ্যতায় ১০, শৃঙ্খলা প্রতিবেদনে ১০ এবং এসএসবির মূল্যায়নে ১০ নম্বর থাকবে। অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেতে যুগ্মসচিব পদে ২ বছর চাকরির জন্য ১০, কর্মমূল্যায়নে ৫০, সিনিয়র স্টাফ কোর্স (এসএসসি) প্রশিক্ষণে ১০, শিক্ষাগত যোগ্যতায় ১০, শৃঙ্খলা প্রতিবেদনে ১০ এবং এসএসবির মূল্যায়নে ১০ নম্বর থাকবে।

খসড়া নীতিমালায় পদায়নের বিষয়ে বলা হয়, সরকার উপযুক্ত কর্মকর্তাকে জ্যেষ্ঠতা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চাকরির অভিজ্ঞতা, বিশেষ বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বিবেচনা করে সচিব হিসাবে পদায়ন করবে। পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং উৎকৃষ্ট কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এতে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তারা অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনে উৎসাহী ও মনোযোগী হবে। প্রণোদনা হিসাবে উদ্ভাবনী কাজের স্বীকৃতি ও পুরস্কার দেওয়া হবে। থাকবে বিদেশে প্রশিক্ষণে যাওয়া এবং উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ। ভালো ও প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বৈদেশিক মিশন-দূতাবাসে পদায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়, উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা অ্যাডভান্স কোর্স অন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (এসিএএম) বাধ্যতামূলকভাবে করতেই হবে। এছাড়া প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও কৌশলগত পরিকল্পনা, সরকারি ক্রয় ও ব্যবস্থাপনা, বাজেট ও অর্থ ব্যবস্থাপনা, উদ্ভাবন, ই-গভর্ন্যান্স, ই-নথির ব্যবহার এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। যুগ্মসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য সিনিয়র স্টাফ কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রশিক্ষণে স্ট্র্যাটেজিক লিডারশিপ, নীতিনির্ধারণী কর্মকৌশল প্রস্তুতকরণ, পলিসি বিশ্লেষণ, পাবলিক ম্যানেজমেন্ট রিফর্ম, ভূরাজনীতি, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট, বিনিয়োগ পরিবেশ, অর্থনৈতিক কূটনীতি, সরকার পরিচালনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণী বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কোর্সের অংশ হিসাবে তাদের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় অথবা আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিদর্শনে পাঠানো হবে। অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য পলিসি প্ল্যানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কোর্স (পিপিএমসি) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া তাদের সরকার নির্ধারিত অন্যান্য প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিতে হবে। সিনিয়র সচিব ও সচিবরা দেশের সমসাময়িক এবং সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী বিষয়ে কর্মশালা, সেমিনারে অংশ নেবেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে বছরব্যাপী নিয়মিত কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করবে।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, একজন ডিসি এক জেলায় তিন বছর এবং একাধিক জেলায় ৪ বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। বর্তমানে তিন বছরের বেশি কেউ ডিসি হিসাবে থাকার নিয়ম নেই। ডিসি পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তার বয়স হবে ৪৫ বছর। বর্তমানে ডিসি পদে নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়স ৫০ বছর নির্ধারণ করা আছে। যুগ্মসচিবদের মধ্য থেকে বিভাগীয় কমিশনার নিয়োগ করা হবে। তাদের সর্বোচ্চ বয়স হবে ৫২ বছর এবং এক বিভাগে দুই বছরের বেশি কেউ বিভাগীয় কমিশনার থাকতে পারবেন না। তবে একাধিক বিভাগে তিন বছর থাকতে পারবেন। অতিরিক্ত সচিবদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তারা তিন বছরের বেশি এক মন্ত্রণালয়ের কাজ করতে পারবেন না। তবে সরকার চাইলে এ মেয়াদ হ্রাস-বৃদ্ধি করতে পারবে। চাকরির ২০তম বছরে উপসচিব কিংবা যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেতে ব্যর্থ কর্মকর্তাকে তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপসচিব কিংবা যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে সব ধরনের আর্থিক সুবিধাসমেত অবসরে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে খসড়া নীতিমালায়।

সরকার উপযুক্ত কর্মকর্তাদের সচিব পদে নিয়োগ দেবেন। সেক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, চাকরির অভিজ্ঞতা, বিশেষ বিষয়ে জ্ঞান এবং দক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে। কমপক্ষে তিন বছর সচিব পদে চাকরি করা কর্মকর্তাকে সিনিয়র সচিব পদে পদায়ন করা হবে। মুখ্যসচিব ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব পদে পদায়নের ক্ষেত্রে তিন বছর সচিব পদে চাকরির অভিজ্ঞতার সঙ্গে মাঠ প্রশাসনে চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি এবং শিক্ষাজীবনের সব পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি ও বিভাগ পাওয়া কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পদায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিক্ষাজীবনে কোনো পর্যায়ে তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্তরা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পোস্টিং পাবেন না। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে নিযুক্ত কর্মকর্তারা মূল বেতনের ৫০ ভাগ হারে প্রণোদনা ভাতা পাবেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণে শতকরা ৭৫ ভাগ নম্বর পাওয়া কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পদায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কর্মজীবনে বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন না করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে খসড়া নীতিমালায়।

সম্পর্কিত খবর

কোন উইজেট পাওয়া যায়নি. উইজেট পৃষ্ঠায় যান এবং অফক্যানভাস সাইডবার উইজেট এলাকায় উইজেট যোগ করুন।.