বৃটিশ শাসন আমলের আগে বাংলাতে প্রায় ৮০ হাজার মক্তব ও মাদ্রাসা ছিল।১৭৮০ সালে মাদ্রাসাতে আলিয়া ধারা চালু হওয়ায় মাদ্রাসাতে ২ টি বিভাগ দেখা যায়।একটি আলিয়া মাদ্রাসা ও অন্যটি কাওমী ধারা।আলিয়া মাদ্রাসা ১৭৮০ সালে জন্ম হয়।আলিয়া মাদ্রাসাগুলো পবিত্র কোরানের সূরায়ে বাকারার ২০১নং আয়াত “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতা, ওয়াফিল আখিরাতে হাসানাতা, ওকেনা আজাবান্নার।অর্থাৎ হে আমাদের মালিক আমাদিগকে দুনিয়াতে ও কল্যান দান কর এবং আখিরাতে ও কল্যান দান কর।আমাদিগকে দোজগের আগুন থেকে রক্ষা কর( Give us of good in the world,o lord,and give us of good in the life to come and suffer us not to suffer the torment of hell) নীতির উপর যাত্রা শুরু করে।এখানে স্পস্ট যে আখিরাতের কল্যানের জন্য এখানে কোরান,হাদীস,ফিকহ আরবী যেমনি অত্যাশ্যক তেমনি বাংলা,ইংরেজী,গনিত,আইসিটি,বিজ্ঞান ও ইতিহাস ও দুনিয়াবি কল্যানের জন্য অত্যাবশ্যক। কাওমী শিক্ষা শুধু পরকালিন মুক্তির বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে দেওবন্দের নীতিমালায় পরিচালিত।১৭৮০ সালের আলিয়া মাদ্রাসাগুলি থেকে লেখা পড়া করে এক সময় যেমনি সহীহ আলেম,মফাসসির,মুহাদ্দিস,ফকীহ বের হত তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনা করা,বিচারপতির দায়িত্ব পালন এবং চিকিৎসা সহ গবেষনাতে তাদের প্রভাব ছিল লক্ষ্যনীয়। ১৮৫৮ সালে ইংরেজরা লাখেরাজ ভূমি বাতিল করে মাদ্রাসার ওয়াক্ফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে।তখন থেকেই আলিয়া মাদ্রাসার দৈন্যদশা শুরু।১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভাজনে আলিয়া মাদ্রাসা ও দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়।বর্তমান ভারতের আলিয়া মাদ্রাসাগুলিতে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীরা যেমনি অধ্যায়নের সুযোগ পায় তেমনি হিন্দু শিক্ষক ও সেখানে নিয়োগ পায়।২০০৭ সালে কামিল মাস্টার্স সমমান লাভ করে।শিক্ষকদের সুযোগ – সুবিধা অনেক বেড়ে যায়।কিন্তু শুধু মাদ্রাসা শিক্ষার গুনগত মান তলানিতে পৌঁছে।যার ফলে সরকার মানহীন মাদ্রাসাগুলোকে জাতীয়করন থেকে বঞ্ছিত করে।মাদ্রাসা শিক্ষা আজ অনেকটা চার দেওয়ালে বন্দি।মাদ্রাসা ছাত্রদের বর্তমানে অবস্থা হল এই যে পাস করলে সরকারি চাকুরি তাদের জন্য স্বপ্ন হয়ে যায়। বাংলাদেশের মোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২৫% ই হল এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা। অথচ মোট সরকারি চাকরির বাজারে ১০% ও মাদ্রাসা থেকে পাস করা ছাত্রছাত্রীদের দখলে নাই।যে ১০% মাদ্রাসা থেকে পাস করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করছে তাদের অধিকাংশই আলিম তথা এইচ এস সি পাসের পর কোন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজে থেকে স্নাতক নিয়ে ঐ সরকারি চাকুরিতে প্রবেশ করছে।প্রতি বছর আলিম পাসের পর জিপিএ ৪ থেকে ৫ পর্যন্ত পাওয়া মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ছুটছে নামী দামী কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। ফলে মেধাশূণ্য হচ্ছে আলিম/ফাজিল/কামিল মাদ্রাসা।কেন মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীরা মাদ্রাসাতে উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা থাকার পরও মাদ্রাসা ছেড়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটছে? তাহলে কি মাদ্রাসাতে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা নাই? নাকি মানহীন লোক দেখানো উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে? এবার আলোচনা করা যাক উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে কি বুঝি।অক্সফোর্ড, হার্ভাড,ক্যমব্রিজ,আল আজহার,মদিনা,মক্কা,সহ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সমুহের তথ্য মতে উচ্চ শিক্ষা বলতে বোঝায় নতুন জ্ঞানের সৃজন ও প্রশিক্ষন এবং গবেষনার মাধ্যমে জ্ঞানের সীমারেখাকে ক্রমাগত বিস্তৃত করা।তার মানে যেখানেই উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা আছে সেখানেই যত বিষয় পাঠদান হবে তাতে নতুন জ্ঞানের সৃজন,প্রশিক্ষন এবং গবেষনার পথ থাকতে হবে।তাহলে মাদ্রাসার উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ফাজিল অনার্স/ডিগ্রি কিংবা কামিলের যত বাংলা, আরবি, ইংরেজী বিষয় থাকবে তাতে সৃজনশীল এবং গবেষনাধর্মী জ্ঞান প্রসারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।যত সেমিনার হবে তাতে প্রশিক্ষনে জেনারেল ও এ্যারাবিক শিক্ষক উভয়ের অংশ গ্রহন থাকতে হবে।অথচ এগুলির খুব কম প্রয়োগ থাকার কারনেই মাদ্রাসার মান ও উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা হুমকির মুখে।
মাদ্রাসা শিক্ষার মান উন্নয়ন ও মাদ্রাসাতে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে যা দরকার তা হল: ক• আলিয়া মাদ্রাসাগুলি যেহেতু এ্যারাবিক ও নন এ্যারাবিক দুইয়ের সমন্বয়ে পরিচালিত এবং এখানে উভয়ের কার্যক্রম মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। তাই আরবি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট বোর্ডে আরবি শিক্ষিত ও জেনারেলদেরকে সমহারে পদায়ন করতে হবে।কারন শুধু আরবি শিক্ষিতরা সিন্ডিকেট মেম্বার থাকলে মাদ্রাসার জেনারেল বিষয়গুলি পিছনে পড়বে।মাদ্রাসার উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হবে।খ•আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয়কে অন্যান্যদের কথায় কান না দিয়ে সরকারি নীতিমালা মোতাবেক আরবি বিষয়ের পাশাপাশি ইংরেজী ,বাংলা,আইসিটি,সমাজ বিজ্ঞান ইত্যাদি সহ জেনারেল বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করতে হবে। যাতে মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীরা কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেয়। গ• দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া ডিগ্রি,অনার্স- মাস্টার্স এর মান প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।তাই প্রশাসনে আরবি শিক্ষিতদের পাশাপাশি জেনারেলদেরকে ও পদায়ন করতে হবে।কারন প্রশাসন চালাতে আরবির কোন প্রয়োজন নাই।অন্যদিকে ক্লাশে বিষয়ভিত্তিক পাঠদান আর প্রশাসন চালানো সম্পূর্ন ভিন্ন জিনিস।আর যারা প্রশাসন পরিচালনা করেন তারা নিজের মনগড়া নয় বরং নীতিমালা অনুসরন করেই প্রশাসন পরিচালনা করেন। ঘ• দক্ষ ও গুনগত মান সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ নিয়োগ দান করা।ঙ• প্রয়োজনীয় ভৌত অব কাঠামোর বন্দোবস্ত করা।চ• উচ্চ শিক্ষাখাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বরাদ্দ বাড়ানো।ছ• প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন করতে হবে।বিশ্লেষণধর্মী ও সকল অধ্যায়ের সংমিশ্রণে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে হবে।আগের বছরের প্রশ্নের টপিক পরের বছরে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে।এতে নোট ও ফটোকপির উপর নির্ভরশীলতা কমে যাবে।শিক্ষার্থীর গবেষনাধর্মী লেখাপড়া বৃদ্ধি পাবে।জ• শিক্ষকদের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাকল্পে ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।ঝ• মাদ্রাসাতে এমপিল ও পিএইচডি ডিগ্রি চালু করতে হবে।ঞ• গ্রন্থাকার কে গ্রন্থ ও জার্নালে সমৃদ্ধশালী করতে হবে।ট• নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে একটি সৃজনশীল উচ্চশিক্ষিত কর্মি বাহিনী গড়ে তোলার জন্য সিঙ্গাপুরের মত Learning to think and thinking to learn এর ভিত্তিতে সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে।ঠ• তথ্য প্রযক্তি বিষয়ক স্বতন্ত্র বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।ড• মাদ্রাসাতে চাকুরি উপযোগী কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা চালু করতে হবে।ঢ•শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন অসম্ভব।তাই মাদ্রাসাগুলোকে জাতীয়করন করা অতীব জরুরি ।ণ•সার্টিফিকেট সর্বস্ব মূল্যায়ন উঠিয়ে দিয়ে কে কত জ্ঞানী তা মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে হবে। ত• আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রবিধান ২০১৯ এর ৭ পৃষ্ঠার ২.১অনুচ্ছেদ মতে মাদ্রাসায় ক্লাস ওয়ান থেকে আলিম পাস করার পর আরবি বিশ্ববিদ্যালয় চালুকৃত ইস: ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয় সহ অন্য বিষয়ে ৪+১ বছর অনার্স-মাস্টার্স পাস করা মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীরাই মাদ্রাসার প্রশাসনিক পদে আবেদন করতে পারবেনা।অথচ সাধারন কামিল ও সাধারন ডিগ্রি নিয়ে তুলনামূলক কম যোগ্যরা মাদ্রাসার প্রশাসনিক পদে আবেদন করতে পারবে। এটি বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(১),২৮(১),২৮(৩),২৯(১),২৯(২) অনুচ্ছেদ পরিপন্থী। তাই আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রবিধান ২০১৯ এ বৈষম্য প্রথা বাতিল করতে হবে।থ• মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্রছাত্রীরা এনটিআরসি এর নিয়োগ পরিক্ষায় গনিত, ইংরেজী,তথ্যপ্রযুক্তি সহ অনেক জেনারেল বিষয়ে ফেল করার কারনে নিবন্ধন পরিক্ষায় কাঙ্খিত সংখ্যক ছাত্রছাত্রীরা পাশ করতে পারেনা ।আরবির পাশাপাশি জেনারেল বিষয়কে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।দ• মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মহোদয় গন ক্যাশের ভাউচার নিজের হাতে লিখার চেষ্টা করেন, অধ্যক্ষদের এই গৌন কাজ বাদ দিয়ে নিজ কাজে মনোযোগ দিতে হবে।ধ• মাদ্রাসা শিক্ষা,শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দের মাঝে নেগেটিভ চিন্তা- ভাবনা দূর করতে এবং স্বাধীনতাত্তোর দেশের জনগোষ্ঠীকে একই কাতারে শামিল করে একটি অভিন্ন মানব চেতনা ও জাতীয় চেতনা উদ্ধুদ্ধ করতে মাদ্রাসা পাঠ্যক্রমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং সংগ্রামের প্রতি পর্বের কৃতিত্বপূর্ন বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।ন• আরবি ভাষার প্রতি জোর দিতে হবে এবং প্রত্যেক মাদ্রাসায় এ্যারাবিক ল্যাংগুয়েজ ক্লাব চালু করতে হবে।প• বাংলাদেশে মাদ্রাসায় ছাত্র ও ছাত্রী প্রায় সমান। তাই মাদ্রাসায় নারী শিক্ষিকা নিয়োগ বাড়াতে হবে।ফ• মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের মাদ্রাসার প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দান বন্ধ রাখতে হবে।
ফিরোজ আলম,প্রভাষক ও বিভাগীয় প্রধান,আয়েশা রা: মহিলা কামিল (অনার্স,এমএ) মাদ্রাসা,লক্ষীপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলা সেক্রেটারী, বিএমজিটিএ
