গাইবান্ধায় রেশম পোকা পালনে স্বচ্ছল ৪৫০ পরিবার

শেয়ার

গাইবান্ধা প্রতিনিধি
গাইবান্ধার তিন উপজেলার প্রায় ৪৫০ জন নারী রেশম পোকা পালন করে সংসারে স্বাবলম্বী হয়েছে। সবধরনের উপকরণ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয় এসব নারীকে। ফলে রেশম পোকা পালন তাদের নেই কোন খরচ। সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরা এসব নারীদের সফলতা দেখে অন্যরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন রেশম পোকা পালনে।

সুন্দরগঞ্জ রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর ও পলাশবাড়ী উপজেলায় রেশম পোকার চাষ শুরু হয়। এসব উপজেলার প্রায় ৪৫০ জন নারী রেশম পোকা পালনে সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছেন। এরমধ্যে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ২০০ জন, সাদুল্লাপুরে ১৫০ জন ও পলাশবাড়ীতে ১০০ জন।

রেশম পেকার খাদ্য হিসেবে তিনটি উপজেলায় প্রায় এক লাখ তুঁত গাছ লাগানো হয়। তুঁত গাছের ডাল রোপণের একবছর পর তুঁত পাতা সংগ্রহ করা যায়। রেশম পোকা তুঁত পাতা ছাড়া অন্য কোন খাদ্য গ্রহন করেনা।

সূত্র আরও জানায়, রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্র রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর, কুমিল্লা ও ঝিনাইদহ থেকে রেশম পোকার ডিম গাইবান্ধায় নিয়ে আসে। পরে এসব ডিম বিনামূল্যে নারীদের দেওয়া হয়। এ ছাড়া পোকা পালনে তাদেরকে বিনামূল্যে ১৪ হাত দৈর্ঘ্য ও ৯ হাত প্রস্থের একটি টিনশেড ঘরও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। পোকা থেকে উৎপাদিত গুটি লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, ঝিনাইদহসহ মোট ১২টি ক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব ক্রয়কেন্দ্রে রেশম গুটি থেকে সুতা তৈরি করা হয়। পরে সেই সুতা পাঠানো হয় রাজশাহী ও ঠাকুরগাঁওয়ের কারখানায়। ওইসব কারখানায় টুপিস, থ্রিপিস, ওড়না, শাড়ী, চাদরসহ বিভিন্ন পোশাক তৈরি হয়। পরে সেই সব পোশাক সারাদেশে বিক্রি হয়।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের আরাজি দহবন্দ গ্রামের রোজিনা বেগম বলেন, স্বামী ফরিদ মিয়া রিকশাচালক। পাঁচশতক বসতভিটা ছাড়া কোনো সম্পদ নেই। স্বামীর আয়ে ঠিকমত সংসার চলেনা। উপরন্ত পড়াশোনার খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয়। সংসারে বাড়তি আয়ের জন্য রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্রের সহায়তায় রেশম পোকা পালন শুরু করি। চারবছর ধরে কোন খরচ ছাড়াই পোকা পালন করছি। রেশমের গুটি তৈরি করছি পোকা থেকে। এই গুটি বিক্রি করে প্রতি বছর ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

রোজিনা বেগমের মত গাইবান্ধার প্রায় ৪৫০ জন নারী রেশম পোকা পালনে সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছেন। তারা সংসারের চাহিদা মেটানোর পরও বাড়তি উপার্জন করছেন। একই গ্রামের মোজেমা বেগম বলেন, স্বামী মোয়াজ্জেম হোসেন পান-সুপারির দোকার করেন। ছেলে হাফিজার (২৪) রিকশা-ভ্যান চালান। হাফিজার বিয়ে করে আলাদা থাকেন। বসতভিটা চার শতাংশ জমি ছাড়া আর কোন জমি নেই। রেশম পোকা পালন করে ছয় শতক জমি কিনেছি। সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে। প্রতিবছর ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা আয় করছেন। একই ইউনিয়নের ফতেহখাঁ গ্রামের আরেক গৃহবধু মিলি বেগম বলেন, স্বামী সৈয়দ ফেরদৌস হাসান মানসিক রোগি। ঠিকমত সবকাজ করতে পারেন না। তাই মা-মেয়ে মুদি দোকান চালাই। দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। দুইবছর ধরে রেশম পোকা পালন শুরু করি। মূলধন ছাড়া শুধু শ্রম দিয়েই প্রতিবছর ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা বাড়তি আয় করছিন।

শুধু তাই নয়, এসব গাছ পরিচর্যা করে আরও ২৪ জন নারীর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। এসব নারী প্রতিমাসে পাঁচ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন। সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মনমথ গ্রামের বন্দনা রানী (৫০) বলেন, তুঁত গাছের পরিচর্যা করে প্রতি মাসে টাকা পাচ্ছেন। ফলে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে। আবার তুঁত গাছের ডাল রান্নায় জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করায় জ্বালানী ব্যয়ও কমেছে।

সুন্দরগঞ্জ রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (সম্প্রসারণ) মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, গাইবান্ধার তিনটি উপজেলায় রেশম পোকা পালনে নারীদের উদ্ধুদ্ধ করছে রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্র। সুবিধাভোগিদের বিনামূল্যে ঘর নির্মাণ, ডিম সরবরাহ ও তুঁত গাছের পাতার যোগান দেওয়া হচ্ছে। তারা কেবলমাত্র শ্রম দিয়েই লাভবান হচ্ছেন। ভবিষ্যতে সারা জেলায় এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

কোন উইজেট পাওয়া যায়নি. উইজেট পৃষ্ঠায় যান এবং অফক্যানভাস সাইডবার উইজেট এলাকায় উইজেট যোগ করুন।.