Pradeep Kumar Rat
ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলার কথা আমরা সবাই জানি। এই মামলার আসামি কামরুন নাহার মনি গ্রেপ্তার হওয়ার সময় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ২০১৯ সালের ১৬ এপ্রিল পিবিআই তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে কারাগারেই তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। মায়ের সঙ্গে শিশুটিও কারাগারে থেকে যায়।
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, আইনি প্রক্রিয়া শেষে কামরুন নাহার মনি তার শিশুকন্যাসহ গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এর আগে চলতি বছরের আগস্টে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে কামরুন নাহার মনিসহ ১০ জন আসামি খালাস পান।
খবরটি পড়ার পর আমার মাথায় বারবার একটি প্রশ্নই ঘুরছে—শিশুটির অপরাধ কী ছিল?
মা কোনো মামলার আসামি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। সেই অভিযোগের বিচার হয়েছে। আদালত শেষ পর্যন্ত তাকে খালাস দিয়েছেন। কিন্তু শিশুটির বিরুদ্ধে তো কোনো অভিযোগ ছিল না। সে তো কোনো অপরাধ করেনি। তাহলে জন্মের পর একটি শিশুকে কেন প্রায় সাত বছর কারাগারের পরিবেশে বড় হতে হলো?
এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো আইনের বইয়ে আছে। কারাগারের নিয়মে আছে। বাস্তবতার নানা ব্যাখ্যাও আছে। কিন্তু একজন শিশু সংগঠনের কর্মী হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় সত্য হলো—একটি শিশুর শৈশব আর ফিরে পাওয়া যায় না।
সাত বছর খুব কম সময় নয়
একটি শিশুর জীবনে সাত বছর অনেক বড় সময়।
এই সময়ে একটি শিশু হাঁটতে শেখে, কথা বলতে শেখে, স্কুলে যায়, বন্ধু তৈরি করে, খেলাধুলা করে, গান শেখে, ছবি আঁকে, প্রকৃতিকে চেনে। তার পৃথিবী ধীরে ধীরে বড় হয়।
কিন্তু এই শিশুটির পৃথিবী ছিল কারাগারের দেয়ালের মধ্যে।
সে হয়তো জানে না কারাগার কী। সে জানে না মামলা কী। সে জানে না আদালত কী। সে শুধু জানে—তার মা তার সঙ্গে আছেন, আর চারপাশে একটি অস্বাভাবিক পরিবেশ।
একটি শিশুর জন্য এই পরিবেশ কতটা স্বাভাবিক ছিল? তার মানসিক বিকাশে এর কী প্রভাব পড়েছে? বড় হয়ে সে তার শৈশবের এই সময়টাকে কীভাবে মনে করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই হয়তো পাওয়া যাবে না।
কিন্তু প্রশ্নগুলো আমাদের করতেই হবে।
কারণ শিশুরা নিজেদের হয়ে কথা বলতে পারে না। তাদের হয়ে বড়দেরই কথা বলতে হয়।
আমি কেন এতটা ভাবছি
প্রায় চার দশক ধরে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে আমার পথচলা। শৈশব থেকেই শিশুদের নিয়ে কাজ করার সঙ্গে যুক্ত আছি। খেলাঘর আমার কাছে শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়; এটি আমার বেড়ে ওঠারও একটি অংশ।
১৯৫২ সালের ২ মে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের অধিকার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার কথা বলে আসছে। সেই ধারারই একটি সংগঠন সবুজ সেনা খেলাঘর আসর। বর্তমানে রায়পুর উপজেলা শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বহু পরিবারের কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। শিশুদের আনন্দ দেখেছি, কষ্টও দেখেছি। কোনো শিশু যখন অভাবের কারণে স্কুলে যেতে পারে না, কোনো শিশু যখন খেলতে পারে না, কোনো শিশু যখন পারিবারিক সমস্যায় চুপচাপ হয়ে যায়—এসব বিষয় একজন শিশু সংগঠনের কর্মীকে ভাবায়।
কিন্তু একটি শিশু কোনো অপরাধ না করেও দীর্ঘদিন কারাগারে থাকবে— এমন ঘটনা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া আমার জন্য কঠিন।
এটি একজন সংগঠকের কষ্ট। একজন নাগরিকের কষ্ট। একজন মানুষেরও কষ্ট।
আইন মানুষের জন্য, শিশুও মানুষ
আমরা আইন চাই। অপরাধের বিচার চাই। অপরাধী যে-ই হোক, আইনের আওতায় আসুক—এটিও চাই।
কিন্তু আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে কোনো নিরপরাধ শিশু যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
একজন মা যদি কোনো মামলায় কারাগারে থাকেন এবং তার সঙ্গে একটি শিশু থাকে, তাহলে প্রথমেই দেখতে হবে শিশুটির কী প্রয়োজন। তার থাকার জন্য অন্য কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা করা যায় কি না, পরিবারের কেউ তাকে নিতে পারে কি না, রাষ্ট্র বা সমাজকল্যাণের মাধ্যমে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া যায় কি না—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
সব ক্ষেত্রে হয়তো একই ব্যবস্থা সম্ভব হবে না। কিন্তু শিশুর বিষয়টি যেন শুধু মায়ের মামলার একটি আনুষঙ্গিক বিষয় হয়ে না থাকে।
শিশুর নিজের একটি পরিচয় আছে। তার নিজের অধিকার আছে।
সে কারও মামলার অংশ নয়।
মুক্তি পেলেই সব শেষ নয়
আজ শিশুটি কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছে। এটা অবশ্যই আনন্দের খবর। কিন্তু আমার মনে হয়, এখানেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
সাত বছর কারাগারের পরিবেশে থাকার পর একটি শিশুকে হঠাৎ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে হবে। স্কুলে যেতে হবে। অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে হবে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে পরিবারকে যেমন পাশে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে।
শিশুটির পড়াশোনার ব্যবস্থা কী হবে, তার স্বাস্থ্য কেমন, তার মানসিক অবস্থার কী প্রভাব পড়েছে—এসব বিষয় দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা উচিত।
প্রয়োজনে শিশুটির জন্য মানসিক সহায়তা, শিক্ষা সহায়তা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আমরা যদি সত্যিই শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি, তাহলে এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
শিশু সংগঠনগুলোরও কিছু করার আছে
এ ধরনের ঘটনায় শিশু সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে।
আমাদের কাজ শুধু শিশুদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা, খেলাধুলার আয়োজন করা বা শিশু দিবসে আলোচনা সভা করা নয়। কোনো শিশু যখন বিপদে পড়ে, তখন তার অধিকার নিয়ে কথা বলাও আমাদের দায়িত্ব।
খেলাঘরসহ দেশের শিশু-কিশোর সংগঠনগুলো এ বিষয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারে। কারাগারে থাকা নারী আসামিদের সঙ্গে থাকা শিশুদের অবস্থা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
কোনো শিশু যাতে শুধু তার মা-বাবার মামলার কারণে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে জনমত তৈরি করা দরকার।
আইন ও নীতিমালায় কোথাও ঘাটতি থাকলে তা সংশোধনের দাবিও শিশু সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জোরালোভাবে তোলা উচিত।
আদালত ও রাষ্ট্রের কাছে একটি অনুরোধ
আমি বিচারব্যবস্থা বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজের সমালোচনা করতে চাই না। তারা তাদের দায়িত্
